সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ নাটোরে ৫০ বছর আগে ৪৫ বিঘা জমি কিনে ভিটেমাটি হারাতে বসেছে ৩৫টি পরিবার

  

আফরোজা ইয়াসমিন রাজশাহী বিভাগীয়  প্রতিনিধি:নাটোর সদর উপজেলার ফুলসর গ্রামের মানুষ জমি কিনে ভিটেমাটি হারাতে বসেছে প্রায় ৩৫টি পরিবার। ৫০ বছর আগে এসব পরিবারের কেনা প্রায় ৪৫ বিঘা জমি , উপজেলা প্রশাসন জমি দখলে নিয়ে ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন । দখল করে নেওয়া জমিতে রবিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করেন শতাধিক গ্রামবাসী ও জমির মালিকরা।সংবাদ সম্মেলনে প্রশাসনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেন গ্রামবাসীরা । তাঁদের দাবি, তথ্য গোপন এবং জমি খাস খতিয়ানভুক্তের বিষয়টি তাঁরা জানতেন না। প্রায় ৫০ বছরে সরকার কখনো জমির মালিকানা দাবি করেননি। এখন ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন ফুলসর গ্রামের মানুষ । তবে প্রশাসন বলছে, ১৯৭৮ সালে ওই জমি সরকারের নামে খাস খতিয়ানভুক্ত হয়।সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ফুলসর গ্রামে রাস্তার পাশে সিমেন্ট ও রডের স্তূপ। পাশের একটি খোলা জায়গায় একদল শ্রমিক পাকাঘর নির্মাণ করছেন। রাস্তার প্রাশ্বে একটি জমির প্রায় ৩০টি বড়বড় আমগাছ কেটে ফেলেছে নাটোর সদরের এসিলেন্ট জুবায়ের হাবিব এর অর্ডারে । রাস্তা থেকে নেমে কিছুটা দূরে প্রায় দুই একরের চাষ করা জমিতে ইট স্তূপ করে রাখা হয়েছে। পাশে খোলা জায়গায় সংবাদ সম্মেলন করেন গ্রামবাসী।সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ফুলসর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শাজাহান আলী মিয়া, ভিটেমাটি হারানো শরবানু বেওয়া, লিয়াকত হোসেন, নজরুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, অছির উদ্দিন ও ময়েন উদ্দিন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান আলী মিয়া বলেন, ফুলসর মৌজার ৬ নম্বর খতিয়ানের প্রায় ৪০/৫০ বিঘা জমির হাল খতিয়ানের (আরএস রেকর্ড) মালিক ছিলেন অর্পণা দেবী। তিনি স্বত্ববান থাকতে ওই জমি আব্দুল লতিফ, আব্দুল হাই ও আব্দুল রউফের কাছে বিক্রি করেন। তাঁদের কাছ থেকে জমি কিনে গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস ও চাষাবাদ শুরু করে ৩৫টি পরিবার। ৫০ বছর ধরে তাঁরা ওই জমি ভোগদখল করছেন। অনেকে বসবাসের জন্য পাকা বাড়ি ও ফলের বাগান করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি ভূমি কার্যালয়ের লোকজন এসে তাঁদের জানান, ওই জমি ১৯৭৮ সালে অর্পণা দেবীর স্বামী কালিচন্দ্র চক্রবর্তী সরকারের কাছে হস্তান্তর করেন। তখন ওই জমি খাস খতিয়ানভুক্ত করে সরকার। তাই এখন গ্রামবাসীর ওই জমি ছেড়ে দিতে হবে।

ফুলসর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা শরবানু বেওয়া (৯০) বয়সের ভারে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। সংবাদ সম্মেলনে তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী তো টাকা দিয়ে জমি কিনে বাড়ি করেছে। সরকার তো ৫০ বছরে একবারও জমির মালিকানা দাবি করেনি। এখন জমি নিয়ে নিলে আমি নাতিপুতি নিয়ে কোথায় যাব। ফসল ফলাতে না পারলে খাবো কী।গ্রামের পাকা বাড়ির মালিক অছির উদ্দিন বলেন, ‘সরকার তো কখনোই বলেনি এসব জমি সরকার খাস করে নিয়েছে। জানলে তো জীবনের সব উপার্জন দিয়ে এই বাড়ি করতাম না।নজরুল ইসলাম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘গ্রামে ৪০টির মতো পরিবার বসবাস করে। এর মধ্যে ৩০টি পরিবার উচ্ছেদ করলে গ্রামটিই বিলীন হয়ে যাবে। কেনা জমি হারিয়ে আমরা ভূমিহীন-গৃহহীন হব, আর অন্যরা ঘরবাড়ির মালিক হবে। এটা তো অমানবিক। আমরা আদালতে মামলা করেছি। কিন্তু প্রশাসন মামলা শেষ হওয়ার আগেই ঘর নির্মাণ কাজ শুরু করে দিয়েছে।নাটোর সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ জুবায়ের হাবিব বলেন, তৎকালীন রাষ্ট্রপতির ১৯৭২/৯৮ নম্বর আদেশমূলে ১০০ বিঘার অতিরিক্ত জমি রাষ্ট্রের অনুকূলে হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশ অনুযায়ী ফুলসর গ্রামের অর্পণা দেবীর স্বামী কালিচন্দ্র চক্রবর্তী তাঁর পরিবারের ১০০ বিঘার অতিরিক্ত ৩৬ একর জমি রাষ্ট্রের অনুকূলে ফিরিয়ে দেন।মোঃ জুবায়ের হাবিব আরও বলেন, ‘১৯৭৮ সালের ২২ জুলাই ওই জমি সরকারের নামে খাস খতিয়ানভুক্ত করে সরকার। এখন রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সরকার এসব জমিতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা আদালতে মামলা করেছেন। আমরা আদালতের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছুই করব না।নাটোর জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকবে। কারও অন্যায় আবদার মানা হবে না। তবে মানবিক কারণে যে ৩০টি পরিবারের বাড়ি খাসজমিতে আছে, তাঁদের উচ্ছেদ না করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন