ফুচকা-চটপটি বেচে চলে লেখাপড়া ও সংসার বেতন দিয়ে পড়তে হয় প্রতিবন্ধীকে

ফুচকা, চটপটি, চানাচুর আর ঝালমুড়ি বিক্রি করে চলে মো. মিরাতুল ইসলাম মাউন (মোহন) এর লেখাপড়া ও সংসার। ৫০০০ টাকায় প্রতিবন্ধী কার্ড জুটলেও, এখনো জোটেনি ভাতা।  পরিবারের খরচ যোগাতে বড় ভাইকে করে সাহায্য। ঈশ্বরদী দাশুড়িয়া হাট এলাকায় ঈশ্বরদী পাবনা আঞ্চলিক সড়কের ফুটপাতে সুসজ্জিত ভ্যান স্টলের মাধ্যমে চলে মোহন এর ঝালমুড়ি আর ফুচকার দোকান। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, স্কুল ছুটির পর বিকেল থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত দোকান চালান মোহন। কাষ্টমারের ভীড় লেগেই থাকে সারাক্ষণ তার চটপটি-ফুচকার দোকানে। বেশ পরিপাটি করেই সাজিয়েছে ভ্যানগাড়ীর উপর মুখোরুচির বিভিন্ন ভাজাপুড়ি। স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থী, পথচারী এবং সাধারণ লোকজনকে দেখা গেছে অনেক ধৈর্য্য ধরে দাড়িয়ে থেকে বেশ তৃপ্তি করেই ফুচকা, চটপটে, চানাচুর আর ঝালমুড়ি খেতে। 

কর্মজীবি স্কুল পড়–য়া এ প্রতিবন্ধী শিশুর বয়স ১৪ বছর। মোহন ঈশ^রদী উপজেলার দাশুড়িয়া  ইউনিয়নের মুনশিদপুর গ্রামের  মো. শহিদুল ইসলাম ও মোছা. মহিতন খাতুনের ৩য় সন্তান এবং দাশুড়িয়া এম.এম উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণীর ছাত্র।  মোহনরা দুই ভাই এক বোন । বড় ভাই বিয়ে করে স্ত্রী সন্তান নিয়ে একই পরিবারে বসবাস করে। বোনটিরও বিয়ে হয়েছে মাত্র কিছুদিন পূর্বে। মোহনের পিতা তেমন কোন কর্ম করেন না। বড় ভাই মো. মেহেদী হাসান রাজিব  এর ফুচকা-চটপটি বেচে চলে তাদের সংসার। 

মোহনের দোকানের বিভিন্ন কাস্টমার জানান, মোহনের হাতের ফুচকা-চটপটি খুবই সুন্দর হয়। তাই সর্বক্ষণ তার দোকানে ভীড় লেগেই থাকে। তাছাড়া লেখাপড়ার পাশাপাশি এ ব্যবসা করে বলে অনেকেই তার ফুচকার দোকানে আগ্রহের সাথেই বিভিন্ন ভাজা পুড়ি খেতে আসে। 

মো. মিরাতুল ইসলাম মোহন এর সাথে কথা হলে মোহন জানায়, আমি লেখাপড়ার পাশাপাশি নিজে উদ্দ্যেক্তা হয়ে ছোট একটি ব্যবসা করি। ফুচকা, চটপটি, চানাচুর আর ঝালমুড়ি বিক্রি করে আমার লেখাপড়া ও অন্যান্য খরচ চালাই এবং সংসার চালাতে আমার পরিবারকে সহযোগিতা করি। মোহন আরো জানান, ২০১৮ সালে দাশুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণিতে পড়াকালীন টিফিন খেতে বাড়ী যাওয়ার পথে ইঞ্জিন চালিত ভ্যানগাড়ীর সাথে এক্সিডেন্ট করলে তার বাম চোখ নষ্ট হয়ে যায়। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করে সে, এখনও তার চিকিৎসা চলমান রয়েছে। ২০২৩ সালে দাশুড়িয়া এম এম উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই পরিবারের ও নিজের চাহিদা মেটাতেই এই ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করেন সে।  মোহন আরো বলেন, আমি এখন মাঝারী আকারের প্রতিবন্ধী। সরকারি ভাবে বা আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে এখনোও আমি কোন সাহায্য সহযোগিতা পায়নি।

মোহন এর বড় ভাই মো. মেহেদী হাসান রাজিব জানান, আমাদের নয় সদস্যের পরিবারে আমিই একমাত্র উপার্জন করি। আমার বাবা এখন আর কোন কাজ কর্ম করতে পারে না। আমিও ফুচকা, চটপটি, চানাচুর আর ঝালমুড়ি বিক্রি করে এই বড় সংসার চালাই। নিজের খরচ ও পরিবারের চাহিদা মেটাতেই আমার ছোট ভাই পড়া লেখার পাশাপাশি ক্ষুদ্র এ ব্যবসা করে। তিনি আরোও বলেন, আমার প্রতিবন্ধী ভাইয়ের জন্য ৫০০০ হাজার টাকার বিনিময়ে স্থানীয় একজনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী কার্ড পেলেও আজ পর্যন্ত সরকারি ভাতা পায়নি। স্কুল থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা  আমার প্রতিবন্ধী ছোট ভাই মোহনের কপালে জোটে নাই। সরকারি ভাতা ও স্কুল থেকে সহযোগিতা করলে  তার লেখাপড়া ও ক্ষুদ্র ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবে।

মোহন এর চাচা মো. আসাদ জানান, মোহন আমার মামাতো ভাইয়ের ছেলে। লেখাপড়া করে। এক্সিডেন্ট হওয়ার পরে কোন সাহায্য আমরাও করিনি। সরকার থেকেও কিছু পায়নি সে। ফুচকা বেচে সংসার চালায় আর লেখাপড়ার খরচ চালায়। এভাবেই চলতেছে।

মোহন এর বন্ধু ও খেলার সাথী শ্রী বিশ^দাস বলেন, আমার বন্ধু মোহন দাশুড়িয়া হাইস্কুলে ৭ম শ্রেণিতে পড়ে, তার রোল-৪৭। এক্সিডেন্টে তার এক চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। স্কুল ছুটির পর সে বাজারে ফুচকা, চটপটে, চানাচুর আর ঝালমুড়ি বিক্রি করে এবং যে আয় হয় তা দিয়ে সে তার লেখাপড়ার খরচ চালায়। সে লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র এ ব্যবসা করায় আমি তার বন্ধু হিসাবে খুবই গর্ববোধ করি।

খোঁজ খবর ও স্কুলের বেতন আদায় রশিদ নং ৩১৪৮, তারিখ: ০২/০১/২০২৪ ইং সূত্রে জানাগেছে, গত বছরের বকেয়া বেতন বাবাদ ১৩০ টাকা, সেশন ফি বাবদ ৮০০ টাকা, আইসিটি ফি বাবদ ২০০ টাকা এবং ল্যাব ফি বাবদ ১৫০ টাকাসহ মোট ১২৮০/- (এক হাজার দুইশত আশি টাকা) নিয়ে প্রতিবন্ধী মো. মিরাতুল ইসলামকে ৭ম শ্রেনিেেত পূণঃ ভর্তি নিয়েছে দাশুড়িয়া এম এম উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

দাশুড়িয়া এম এম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আয়ুব আলীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৭ম শ্রেণির ‘খ’ শাখার ছাত্র মিরাতুল ইসলাম মাউন  (মোহন) প্রতিবন্ধী এটা আমার জানা ছিলনা। আপনাদের (সাংবাদিক) মাধ্যমেই জানলাম। যে সকল ছেলে-মেয়েরা প্রতিবন্ধী, দুস্থ ও অসহায় আমার বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাদেরকে সব সময় সহযোগিতা করি। আর্থিক বা পোশাক বা শিক্ষা সরঞ্জাম দেয়া সহ বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করে থাকি। এই ছাত্রের (মিরাতুল) বিষয়ে যেহেতু এখন অবগত হলাম আমার প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে।

দাশুড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান ও দাশুড়িয়া এম এম উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি মো. বকুল সরদার বলেন, প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়া একজন প্রতিবন্ধীর নাগরিক অধিকার। আমি সমাজসেবা কমলকর্তার সাথে কথা বলে তার প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করে দেব। স্কুলে যাতে বিনা খরচে লেখাপড়া করতে পারে তার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি আরো বলেন, শুধু এই ছেলেই নয় আমার ইউনিয়নে যদি এমন আরো কোন প্রতিবন্ধী থাকে তবে আমার পরিষদে যোগাযোগ করলে তার ব্যবস্থা করে দেয়া হবে।

ঈশ^রদী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা খন্দকার মাসুদ রানা জানান, বিভিন্ন ক্যাটাগরির প্রতিবন্ধির সংখ্যা ৬৩৭৮ জন। যাদের মধ্যে পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ভাতার উপকার ভোগী ৪৫০০ জন, শিক্ষার্থী প্রতিবন্ধী ভাতা ভোগী ১৩৪ জন। প্রতিবন্ধী কর্মজীবি শিক্ষার্থী মো. মিরাতুল ইসলাম মাউন (মোহন) এর বিষয়ে  প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী আইডি কার্ড হলে সে ভাতার জন্য অনলাইনে আবেদন করতে পারবে। আবেদন করলে বরাদ্দ সাপেক্ষে সে ভাতা পাবে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন